Logo
শিরোনাম :
সাফল্যের ১ম বর্ষপূর্তি উদযাপন করল জোয়ারিয়ানালা স্বেচ্ছাসেবক টিম চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছিনতাইকালে কিশোর গ্যাংয়ের ৩ সদস্য আটক ঈদগাঁওতে এবার সীমিত পরিসরে শারদীয় দূর্গাৎসব উদযাপিত উখিয়ায় জাতীয় স্যানিটেশন ও হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পার্বত্য মন্ত্রীর সাথে রাজাপালং’এর নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিনের সাক্ষাৎ চকরিয়া সংবাদপত্র এজেন্ট জয়নাল কমিশনার আর নেই, বিভিন্ন মহলের শোক হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানে হাউজিং প্রকল্প বন্ধে ৩ সচিবসহ ৯ কর্মকর্তাকে চিঠি কক্সবাজার সমুদ্রে গোসল করতে নেমে শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার দুই ব্রাজিল আরও শক্তিশালী রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক পরিবার,

বাজার আর ইয়াবা বাণিজ্যের দখল নিতেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন খারাবি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ / ৬৬ বার
আপডেট সময় : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২০

মিয়ানমারের বলীবাজারের আদলে উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরের গড়ে উঠেছে ‘বলীবাজার’। এই বাজারে অন্তত ১ হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকানে ‘বিক্রি’ তেমন না হলেও লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকা। এসব লেনদেন কাপড় বা অন্যান্য জিনিস বিক্রির নয়, বেশির ভাগই ইয়াবা ও স্বর্ণ কারবারের।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ফার্মেসী, আচার, সেলুন, মোবাইল, স্বর্ণ, খাবার সহ বিভিন্ন ধরণের দোকান থাকলেও অধিকাংশই কাপড়ের দোকান। বলীবাজারের ভেতরে প্রায় ৪০০ কাপড়ের দোকান রয়েছে। সকাল থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয় ওই বাজার। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তেমন কোন ক্রেতা চোখে পড়েনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর একেক জন ব্যক্তি এসে দোকানের সওদাগরের কাছ থেকে টাকার প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছেন।

এই রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচারের চমকপ্রদ তথ্য। এই বাজারকে ঘিরে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি করতে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। এই গ্রুপে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামও পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, স্থানীয়দের মধ্যে বালুখালীর বলীবাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে জামায়াত নেতা গফুর উল্লাহ। গফুর উল্লাহ বলীবাজারের ৪০০ দোকান থেকে সেলামির নাম দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ১০ কোটি টাকা। প্রতিমাসে ভাড়া উল্লেখ করে অন্তত ১৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন তিনি। অথচ বাজার এলাকাটি সম্পূর্ণ সরকারি।

বলীবাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে গফুর উল্লাহ’র সাথে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবছারের (ইয়াবা মামলায় সদ্য জেল ফেরত) কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছিল। এক পর্যায়ে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

ওই বাজারের ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই মিয়ানমারের বলীবাজারে দোকান করতেন। এজন্য এই মার্কেটের নাম দেওয়া হয়েছে বলীবাজার। বাজারটি পুরোপুরি রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে। কিন্তু তবুও নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন গফুর উল্লাহ।

আধিপত্য বিস্তারের জন্য গফুর উল্লাহ’র সাথে রোহিঙ্গাদেরও সংঘর্ষ হয়েছিল। বলীবাজারের মুদি দোকানদার জাহাঙ্গীর গ্রুপের সাথে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল তার। সেবারও সমঝোতা করেন গফুর উল্লাহ। এরপর গফুর উল্লাহ’র সাথে সিন্ডিকেট করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘আল ইয়াকিন’। আল ইয়াকিন সন্ত্রাসীরা শুরুর দিকে একাধিকবার সংঘর্ষে জড়ানোর চেষ্টা করলেও পরে গফুর উল্লাহ সব গ্রুপের সাথে হাত মিলিয়ে বাজারে নিয়ন্ত্রণ অটুট রেখেছেন।

জানা গেছে, প্রতিমাসে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ সহ বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট মাসোহারা পৌঁছে দেন গফুর উল্লাহ। বর্তমানে বলীবাজার নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় গফুর উল্লাহ, আবছার মেম্বার, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ডা. ওসমান, ফরিদ, মুছা, ডা. ফরিদ ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ আল ইয়াকিন।

বলীবাজারের মুদি দোকানদার জাহাঙ্গীর কয়েক মাস আগে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা সহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর বলীবাজারের কাপড়ের দোকানদার আনোয়ার গ্রেপ্তার হয়। বর্তমানে ওই বাজারের ডা. ওসমান ও মুছাও পলাতক রয়েছে।

বলীবাজারে কয়েকটি দোকান ছাড়া বাকি সবাই ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচারে জড়িত। একজন ফার্মেসী, দুইজন কাপড়ের দোকানদার এবং একজন স্বর্ণের দোকানদার এ প্রতিবেদকের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচার নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তারা।

বলীবাজারের স্বর্ণ ও ইয়াবা কারবারের ডন রোহিঙ্গা ডা. ওসমান। ওসমানের সহযোগী মুছা, ডা. ফরিদ ও মুদির দোকানদার জাহাঙ্গীর। তাদেরকে শেল্টার দেয় আবছার মেম্বার ও গফুর উল্লাহ।

ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে বালুখালীর বলীবাজারে আসে ইয়াবা ও স্বর্ণের চালান। প্রতিটি দোকানে কাপড় সরবরাহ দেয়ার নাটক সাজিয়ে চালান ঢুকানো হয়। একইভাবে ক্রেতা সেজে দোকানে এসে স্বর্ণ ও ইয়াবার চালান নিয়ে যায় পাচারকারীরা। বলীবাজার থেকে স্বর্ণ ও ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ক্যাম্প সহ সারাদেশে।

বলীবাজারের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ও ইয়াবার চালান মজুদকারী ডা. ওসমান, মুছা, আনোয়ার, জাহাঙ্গীর। এরমধ্যে জাহাঙ্গীর ও আনোয়ার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

বালুখালীর বলীবাজারের মত রোহিঙ্গা শিবিরে অসংখ্য বাজার গড়ে উঠেছে। এসব বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই চলে মূল আধিপত্য। আর বাজার কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে ইয়াবা ও স্বর্ণ কারবারের বিশাল সিন্ডিকেট।

জানা গেছে, বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘর্ষে এক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুন্না গ্রুপ। ইতোমধ্যে মুন্না গ্রুপের কয়েকজন সদস্য নিহতও হয়েছে। এখনো পর্যন্ত ক্যাম্পের উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।

আলোচিত মুন্না গ্রুপের মুন্নার উত্থান হয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরের লম্বাশিয়া বাজার ও মোচরা বাজারকে কেন্দ্র করে। এই দুই বাজারে প্রায় ৩ হাজার দোকান রয়েছে। এই দুই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মুন্না গ্রুপ। মুন্না গ্রুপকে স্থানীয়দের মধ্যে শেল্টার দেয় প্রভাবশালী আলী আকবর ও রশিদ আহমেদ।

লম্বাশিয়া বাজার ও মোচরা বাজার আধিপত্য নিয়ে মুন্না গ্রুপের সাথে বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় সংঘর্ষ হয়। এক গ্রুপের সদস্যদের আরেক গ্রুপের সদস্যরা অপহরণ পূর্বক খুনসহ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। বর্তমানে যে সংঘর্ষ চলছে এতে বাজারের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি অন্যতম।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বালুখালী ময়নাঘোনা মরাগাছ তলা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী মুছার শালা। তাকে শেল্টার দেয় আ. লীগ নেতা ফজল কাদের, সাবেক মেম্বার সেলিম। এই তিনজনের নিয়ন্ত্রণে চলা মরাগাছ তলা বাজারে প্রায় ৫০০ দোকান আছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের থাইংখালীর জামতলী হাকিমপাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির, আলী আহমেদ। এই বাজারে ৫ শতাধিক দোকান রয়েছে।

বালুখালী জুমেরছড়া বাজারে দোকান রয়েছে ২ শতাধিক। এই বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে আবছার মেম্বার ও লুৎফুর রহমান নয়ন।

সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে গড়ে উঠা বাজারগুলো আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারের মূল। এই বাজারগুলোতে প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। তাই বাজারগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করা জরুরি। অন্যথায় প্রশাসনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ দরকার।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) এর কো- চেয়ারম্যান আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার করতে চায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। এই বাজারগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। অন্যথায় আধিপত্য বিস্তার শেষ হবে না।

তিনি আরও বলেন, দ্রুত চিরুনি অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। যৌথ বাহিনীর টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন বলেন, বাজারের বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখে। দফায় দফায় যে সংঘর্ষ হচ্ছে সেটা নিয়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বসেছি। পর্যালোচনা চলছে। আমরা কাজ করছি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, কিছু কিছু দোকানের অনুমোদন আছে। অনুমোদিত কোন দোকান যদি থেকে থাকে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘর্ষ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর