Logo

পাল্টে যাচ্ছে সিনেমার গল্পের ধরন

শিহাব আহমেদ / ২০ বার
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

একটি সিনেমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে গল্প। সিনেমার অক্সিজেন হিসেবে কাজ করে গল্প। একটা সময় বাংলা সিনেমার গল্প মানেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেম, নাচ-গান, খলনায়কের বাধা এবং সবশেষে মারধর করে নায়কের জয়। এভাবেই ফর্মুলা সিনেমা নির্মাণ হয়েছে যুগের পর যুগ। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি গল্পের নকল সিনেমাও তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে আবার অনেক নির্মাতা ভিন্ন ধরনের গল্পের সিনেমা নির্মাণ করে প্রশংসিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সিনেমার গল্পে দর্শক নিজেকে খুঁজে পাননি। করোনা-পরবর্তী যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেয়েছে, সেখানে দেখা গেছে প্রতিটি গল্পের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। সেই সঙ্গে সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করে নির্মাতা ও কলাকুশলীরা চলে এসেছেন আলোচনায়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ ছবি দুটির এখনও আলোচনা হচ্ছে। অগ্রিম টিকেট কেটে সিনেমা দেখেছেন দর্শক। এমনকি বিদেশেও সিনেমা দুটি নিয়ে দর্শকের আগ্রহ দেখা গেছে।

সিনেমা হলে দর্শক ফেরার কারণ হিসেবে সবাই বলছেন-গল্পই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফিরিয়ে এনেছে। শিল্পীর ওপর ফোকাস না করে গল্পভিত্তিক সিনেমা নির্মাণেই আগ্রহী হচ্ছেন নির্মাতারা। তবে কি বদলে যাচ্ছে বাংলা সিনেমার গল্প? এই বিষয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘আমরা কিন্তু পূর্বসূরিদের দেখেই সিনেমা নির্মাণ করেছি। তারাও গল্পনির্ভর সিনেমা বানাতেন। আমরাও এই কথাটা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। ছবির জন্য একজন নির্মাতার প্রথম পছন্দ হতে হবে গল্প। কাকে নিয়ে সে সিনেমা বানাবে, এটা পরের ব্যাপার। যে ভালো ভালো গল্প নির্বাচন করতে পারবে সে-ই ভালো নির্মাতা। এ ছাড়া বাস্তব ঘটনা নিয়ে যে সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে সেটা খারাপ নয়। এমন অনেক ঘটনা আছে সাধারণ মানুষ জানে না। এই ছবিগুলোর মাধ্যমে তা জানতে পারছে। এই সিনেমাগুলো দেখার আগ্রহ রয়েছে দর্শকদের। এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের সিনেমাগুলো বাইরের দেশে যাচ্ছে। সেখানে ভালো ব্যবসাও করছে। পুরো বিশ্বেই আমাদের সিনেমা ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই আমাদের সিনেমা লাভবান হবে।’

সত্য ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আগের হতো, আগামীতে আরও সিনেমা নির্মাণ হবে উল্লেখ করে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমা বহু আগ থেকেই হয়ে আসছে। এটা একটা নতুন ফেনোমেনা বলে মনে হয় না আমার। ‘ছুটির ঘণ্টা’ ছবিটা আজিজুর রহমান বানিয়েছিলেন পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে। আমি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বানিয়েছিলাম ২০০৭ সালে খাগড়াছড়ির একটা জিম্মি ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এটা সিনেমার ইতিহাসে অনেক দিন থেকেই হচ্ছে, আরও হবে।’

ভিন্ন ভিন্ন গল্পের সিনেমা দিয়ে দর্শক তৈরি করতে হবে, তাহলে সিনেমার দর্শক বাড়বে মনে করছেন একাধিক সুপারহিট সিনেমার নির্মাতা এসএ হক অলিক। এই নির্মাতা বলেন, ‘গল্প হলো চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। গল্পে যদি টুইস্ট থাকে কিংবা ভিন্নতা থাকে তাহলেই দর্শক সিনেমা দেখার আগ্রহ পায়। দীর্ঘদিন আমাদের সিনেমাতে গল্প বলার ধরনটা একই রকম ছিল। এ কারণেই বোধহয় চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এ ছাড়া আরও নানা কারণ ছিল সিনেমা হলে দর্শক না যাওয়ার। এরপর কোভিডের কারণে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি আরও বিপদে পড়ে যায়। শুধু আমাদের দেশে নয়, কোভিডের কারণে সারা বিশে^র সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি সঙ্কটময় সময় পার করেছে। তবে করোনার পর যখন সিনেমা মুক্তি পাওয়া শুরু করল তখন আবার দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সিনেমার গল্পেই ভিন্নতা রয়েছে, যা দর্শকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।’

তিনি যোগ করে আরও বলেন, ‘দর্শক যা দেখেনি সেটাই পর্দায় দেখতে চায় এবং ভাবতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা, দর্শক হলে ফেরা শুরু করেছে। ভবিষ্যতে যারাই আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করি না কেন, গল্প বলার ধরন ও ভিন্নতার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।’

দর্শক ফর্মুলা ছবির বাইরে নতুন ধরনের গল্প দেখতে চায়। বিষয়টি নিয়ে ‘হাওয়া’ সিনেমার নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, ‘হাওয়া’ ছবি কিন্তু সব শ্রেণির মানুষ দেখেছেন। তার মানে সব শ্রেণির দর্শকের মধ্যে একধরনের নতুন গল্প অনেক দিন ধরে দেখার আগ্রহ ছিল। কিন্তু সে ধরনের ছবি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন হচ্ছিল না। তাই বলে কি তারা সিনেমা দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন? ব্যাপারটা মোটেও সে রকম নয়। তারা ঠিকই নানা মাধ্যমে ছবি দেখতেন। তবে আমার মনে হয় সিনেমার উপস্থাপনাটা যদি সুন্দর করা যায়, নতুন করা যায়, আগ্রহ তৈরি করা যায়-দর্শক ঠিকই আছেন, দর্শক সিনেমা হলে আসবেনই। মানুষের জীবনযাত্রা বদলে গেছে, আমাদেরও বদলে যেতে হবে।’

মেজবাউর রহমান সুমনের কথার সুর ধরেই নির্মাতা আবু শাহেদ ইমন বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই সিনেমার গল্পের একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। সেই প্রতিফলনটাই এখন হয়েছে। এটা অনেক আশার খবর যে, গল্পভিত্তিক সিনেমা দেখতে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন। প্রবীণ ও নতুন নির্মাতারা মিলে আধুনিক প্রযুক্তি ও তাদের নির্মাণশৈলী দিয়ে দর্শকদের আরও ভালো কিছু উপহার দেবেন-এটাই প্রত্যাশা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওটিটির কারণে দেশের বাইরেও আমাদের কাজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এখন আমাদের সিনেমাও বিদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভালো করছে। সেটা অনেক আশাব্যঞ্জক দিক। তবে বলব সবার মধ্যে যে একটা চেষ্টা ছিল এই বিষয়টা সেটারই প্রতিফলন।’

তরুণ নির্মাতা সৈকত নাসির বলেন, ‘দর্শকের রুচিবোধের পরিবর্তন হয়েছে। আগের ফর্মুলা থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছেন তারা। আমাদের দেশে ভারতের দক্ষিণি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সিনেমাগুলো অনেক ফলো করে। মালয়ালমে কিন্তু বেশিরভাগ সিনেমা গল্পনির্ভর হয়ে থাকে। এ ছাড়া প্রযুক্তির কারণে বাইরের দেশের নির্মাণও খুব সহজে মানুষ দেখতে পাচ্ছে। সেই জায়গা থেকেই তারা গল্পভিত্তিক কাজ দেখতে চায়। দর্শক প্রতিটি গল্পেই নতুন কিছু দেখতে চায়। আমাদের দেশেও গল্পভিত্তিক সিনেমার সংখ্যা বাড়ছে। একটু সময় নিলেও দর্শক কিন্তু আমাদের গল্পগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। শুধু গল্প নয়, সিনেমার পোস্টারেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পোস্টারের মাধ্যমেও যে দর্শক আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়, সেই চেষ্টাও করছেন নতুন নির্মাতারা।’

এই সময়ের আলোচিত নির্মাতা রায়হান রাফি বলেন, ‘গল্প বলার ধরন যুগের পর যুগ ধরেই পরিবর্তন হয়ে আসবে। প্রতিটি মানুষ যেহেতু আলাদা, তাই প্রত্যেকের গল্প বলার ধরন একেক ধরনের। এটা যার যার স্বাধীনতা। তবে বড় বিষয় হচ্ছে, দর্শক এই পরিবর্তনটা ভালোভাবে গ্রহণ করছে।’

মুক্তি প্রতীক্ষিত ‘বিউটি সার্কাস’, ‘দামাল’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’ এবং ‘ব্ল্যাক ওয়ার’ ছবির মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় নতুন দর্শক তৈরি হবে, সিনেমার ব্যবসা বাড়বে-এমনটাই প্রত্যাশা সিনে-সংশ্লিষ্টদের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর